মধ্যপ্রাচ্যের ওপর জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে এখন বিকল্প উৎস হিসেবে মার্কিন তেল ও গ্যাসের দিকে ঝুঁকছে এশিয়ার দেশগুলো। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে বর্তমানে মার্কিন জ্বালানির ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে এশিয়ার দেশগুলো এখন তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে বিকল্প উৎস হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছে।
সংকটের মূলে সংঘাত ও সরবরাহ বিঘ্ন
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে পণ্য পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এই রুট দিয়ে প্রতিদিন বিশ্ববাজারের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় এশিয় অঞ্চলের প্রধান আমদানিকারক দেশ— চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণের চেষ্টা জোরদার করেছে।
মার্কিন জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার সুযোগে মার্কিন অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চাহিদা এশিয়ায় রেকর্ড ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এবং নিউ মেক্সিকোর পার্মিয়ান বেসিন থেকে উৎপাদিত তেলের রপ্তানি আদেশ আগের মাসের তুলনায় প্রায় ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলোর পদক্ষেপ:
- ভারত ও চীন: লজিস্টিক খরচ বেশি হওয়া সত্ত্বেও আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে আগ্রহী হচ্ছে।
- জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া: কৌশলগত মজুত (Strategic Reserve) বাড়ানোর পাশাপাশি তারা মার্কিন এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়িয়েছে।
- দক্ষিণ এশিয়া: বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের দেশগুলোও স্পট মার্কেট থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তা এড়াতে বিকল্প বাজারের খোঁজ করছে।
বাজারের ওপর প্রভাব
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. হারুনুর রশীদ বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতি-নির্ভরতা এশিয়ার অর্থনীতির জন্য সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। বর্তমান সংঘাত সেই ঝুঁকিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। মার্কিন তেলের সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থা এশিয়ার বাজারকে নতুন দিশা দিচ্ছে।”
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার দিকে হেলে পড়তে পারে।

