রক্তাক্ত ইরান: যৌথ অভিযানে নিহতের সংখ্যা সহস্রাধিক, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মহাপ্রলয়ের হুমকি
তেহরান ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ৫ মার্চ, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ও ‘রোয়ারিং লায়ন’-এর পঞ্চম দিনে ইরানে নিহতের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। বুধবার তেহরানসহ ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে নজিরবিহীন বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনী। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়ে পাল্টা হামলা শুরু করেছে।
হামলার ভয়াবহতা ও হতাহত
মানবাধিকার সংস্থা এবং ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্যমতে, গত পাঁচ দিনের টানা বর্ষণে এখন পর্যন্ত ১,০৪৫ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ বেসামরিক নাগরিক। বিশেষ করে মিনা এলাকায় একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে ১৮০ জন স্কুলছাত্রী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
বুধবারের হামলায় বিশেষ লক্ষ্যবস্তু ছিল:
- তেহরান: সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবন এবং বাসিজ (Basij) বাহিনীর সদর দপ্তর।
- কোম: ধর্মীয় পবিত্র এই শহরে ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’-এর সভায় হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েল।
- ইসফাহান: এই অঞ্চলের নিরাপত্তা স্থাপনা ও পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের কাছের ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- পশ্চিমাঞ্চল: দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চৌকিগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ও আঞ্চলিক অস্থিরতা
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই ধৃষ্টতার মূল্য হবে মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর বিনাশ।”
ইতোমধ্যেই ইরান তার প্রতিশোধমূলক হামলার পরিধি বাড়িয়েছে:
১. উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা: কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং ওমানের বিভিন্ন তেল স্থাপনা ও বন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
২. নৌপথে সংঘাত: ভারত মহাসাগরে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ মার্কিন টর্পেডোর আঘাতে ডুবে যাওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
৩. মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি: কুয়েতে ইরানি ড্রোন হামলায় এ পর্যন্ত ৬ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে হোয়াইট হাউস।
নেতৃত্বের সংকট ও অনিশ্চয়তা
সংঘাতের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটিতে এক ধরনের নেতৃত্বহীনতা তৈরি হয়েছে। তার নির্ধারিত জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান চলমান যুদ্ধের কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, “ইরানের শাসনব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
বিশ্বের উদ্বেগ
এদিকে কাতার, সৌদি আরব ও জর্ডান তাদের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং হাজার হাজার মানুষ তেহরানসহ বড় শহরগুলো ছেড়ে পালাচ্ছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত অবিলম্বে থামানোর আহ্বান জানালেও কোনো পক্ষই নতি স্বীকারের লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
দ্রষ্টব্য: পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। সর্বশেষ আপডেট পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, গত কয়েকদিনে যুদ্ধে প্রায় এক লাখ মানুষ তেহরান ছেড়েছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন, ‘ট্রাম্প কূটনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি আলোচনার টেবিলকে ধ্বংস করে দিয়েছেন।’
সূত্র : আল-জাজিরা।
এমএআর/

