হারিয়ে যাচ্ছে লাল কাপড়ে মোড়ানো নস্টালজিয়া: অস্তিত্ব সংকটে বাঙালির ‘খেরো খাতা’
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ‘দাদা খাতা নেন, খাতা নেন!’—পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের সরু গলিতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে এভাবেই হাঁকডাক দিচ্ছিলেন ব্যবসায়ী মো. মহিদুল ইসলাম। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও আশানুরূপ কোনো ক্রেতার দেখা নেই। অথচ এক সময় বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আসার মাসখানেক আগে থেকেই এই লাল খাতা কেনার ধুম পড়ে যেত।
পুরোনো বছরের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা বিগত এক বছরের হিসাবের খাতা তুলে রেখে নতুন বছরের জন্য নতুন খাতা খোলেন। আর এই ঐতিহ্যের সঙ্গে কয়েকশ বছর ধরে জড়িয়ে আছে লাল কাপড়ে মোড়ানো খাতা, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘খেরো খাতা’ নামেই পরিচিত। তবে সময়ের পরিক্রমায় এবং প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আজ এই ঐতিহ্যের গায়ে লেগেছে বিলুপ্তির হাওয়া।
স্মৃতির পাতায় ধুলো
একটা সময় ছিল যখন পহেলা বৈশাখের হালখাতা মানেই ছিল দোকানে দোকানে লাল কাপড়ে মোড়ানো এই মোটা খাতা। মোটা কাগজ আর লাল শালু কাপড়ে বাঁধানো এই খাতাগুলো ছিল আভিজাত্য এবং বিশ্বাসের প্রতীক। আজও প্রবীণ ব্যবসায়ীরা এই খাতার প্রতি টান অনুভব করেন, কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কাছে এর কদর আগের মতো নেই।
ব্যবসায়ী মহিদুল ইসলাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “আগে দম ফেলার সময় পেতাম না। বড় বড় মহাজনরা এসে থরে থরে খাতা নিয়ে যেতেন। এখন সবাই কম্পিউটার আর মোবাইলে হিসাব রাখেন। শখের বশে দু-একজন ছাড়া আর কেউ এই খাতা নিতে চান না।”
ডিজিটাল জোয়ারে কোণঠাসা ঐতিহ্য
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যারের সহজলভ্যতা এই লাল খাতার বাজারকে সংকুচিত করে ফেলেছে। এখন ক্ষুদ্র থেকে বড় সব ব্যবসায়ীই ‘ট্যালি’ বা বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে হিসাব রাখতে পছন্দ করেন। এতে যেমন সময় বাঁচে, তেমনি ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে।
কারিগরদের দুর্দিন
খাতা বিক্রিতে মন্দা আসায় বিপাকে পড়েছেন এই খাতা তৈরির কারিগররাও। লাল কাপড় কাটা, আঠা দিয়ে কাগজ জোড়া দেওয়া এবং সুঁই-সুতা দিয়ে সেলাই করার যে নিপুণ শৈলী, তা এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। অনেক কারিগর এখন পেশা পরিবর্তন করে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
সংস্কৃতির এক অধ্যায়
বাঙালির ব্যবসা-বাণিজ্য আর লোকসংস্কৃতির এক অনন্য স্মারক এই লাল খাতা। কেবল হিসাবের খাতা হিসেবে নয়, এটি ছিল ব্যবসায়িক সততা আর সম্পর্কের প্রতীক। প্রযুক্তির ভিড়ে হয়তো হিসাব রাখার ধরন বদলেছে, কিন্তু লাল কাপড়ের সেই মলাটটি আজও বয়োজ্যেষ্ঠদের মনে নস্টালজিয়া জাগিয়ে তোলে।
অস্তিত্ব সংকটে থাকা এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে সাংস্কৃতিক সচেতনতা আর বিশেষ কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তা না হলে হয়তো অচিরেই যাদুঘরের কাঁচের শোকেসে ঠাঁই হবে বাঙালির এই প্রিয় ‘খেরো খাতা’র।

